‘ক্ষুদ্রঋণের জনক ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ইউনূস বাংলাদেশে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন, এখানকার সরকার তার সুখ্যাতিতে বিরক্ত।’
ফ্রান্সের প্রভাবশালী দৈনিক ‘লা মঁদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম এটি।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই দৈনিকটি প্রফেসর ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে একটি প্রতিবেদন ফলাও করে প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটির বিশেষ সংবাদদাতা ফ্রেডেরিক ববিনের ঢাকা থেকে প্রেরিত জবানির একটি অংশে বলা হয়, ঢাকার সাধারণ মানুষ মনে করেন—
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রফেসর ইউনূসকে একজন বড় শত্রু মনে করেন, যার কারণ ব্যক্তিগত ঈর্ষা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা এবং অকৃতজ্ঞতা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রথম দর্শনে স্বাভাবিক মনে হলেও গত কয়েক বছর ধরে মনে হয়েছে তিনি (প্রফেসর ইউনূস) কারও কারও ঈর্ষার কারণ ঘটিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আক্রমণ শুরু হয় দেশের সরকারের কোনো মহলের নিপুণ আয়োজনে। গত ২৮ জানুয়ারি প্রফেসর ইউনূস ডাভোসে (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে) অংশগ্রহণ করতে পারেননি, কারণ ওই সময় তাকে ঢাকার একটি আদালত সমন জারি করেছিল—জনৈক পৌর স্বাস্থ্য পরিদর্শকের অভিযোগের ভিত্তিতে। অভিযোগটি হলো গ্রামীণ ডেনোন কোম্পানির পুষ্টিসমৃদ্ধ দইয়ে ভেজাল পাওয়ার। গ্রামীণ ডেনোন ফ্রান্সের ডেনোন কোম্পানি এবং গ্রামীণ কোম্পানিগুলোর একটির মিলিত সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগ। এর আগে ১৮ জানুয়ারি তাকে যেতে হয়েছিল ঢাকা থেকে ১০০ কিলোমিটার উত্তরে এক আদালতে হাজিরা দিতে, যেখানে বর্তমান সরকারের সহযোগী ক্ষুদ্র একটি বামপন্থী দলের এক সদস্য তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।
২০০৭ সালে প্রফেসর ইউনূস (ফরাসি বার্তা সংস্থা) এএফপিকে এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি টাকা বানানোর উপায় বৈ নয়। এই সাধারণ মন্তব্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ওই নেতা নিজের মানহানি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। মনে হচ্ছে, এসব প্রফেসর ইউনূসকে হয়রানি করার প্রকৃষ্ট উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার এক বন্ধু শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ‘স্পষ্টত একটি রাজনৈতিক আক্রমণ কর্মকাণ্ড চলছে (তার বিরুদ্ধে)।’
‘পুরো ঘটনাটির সূত্রপাত হয়েছিল ২০১০-এর ৩০ নভেম্বর নরওয়েজিয়ান এনআরকে চ্যানেলে একটি ডকুমেন্টারি দেখানোর মাধ্যমে। এতে সাধারণভাবে ক্ষুদ্রঋণ এবং বিশেষভাবে গ্রামীণ ব্যাংককে সমালোচনা করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ১৯৯৬ সালে বেআইনিভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থ গ্রামীণের আরেকটি তহবিলে সরানো হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের রাজধানীতে প্রায় সবারই ধারণা এই উত্থাপিত বিতর্ককে এখানে পুরনো প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে সাধারণ মত হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রফেসর ইউনূসকে একজন বড় শত্রু মনে করেন, যার কারণ ব্যক্তিগত ঈর্ষা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা এবং অকৃতজ্ঞতা। ১৯৮৩ সালে সরকারের সমর্থন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও সরকারের নানা কর রেয়াত ও প্রশাসনিক সুবিধাদি ভোগ করলেও গ্রামীণ ব্যাংক সফল হওয়ার ও প্রফেসর ইউনূসের জন্য সুখ্যাতি বয়ে আনার বিষয়ে সরকারের ভূমিকার জন্য যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা ইউনূস প্রকাশ করেননি—এমন একটি ধারণাও রয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এ বিষয়ে যথেষ্ট রেগে রয়েছেন। জনৈক বিদেশি পর্যবেক্ষকের মতে, ‘যখনই একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ বিদেশে যান তাকে শুনতে হয় তারা কত সৌভাগ্যবান যে প্রফেসর ইউনূস তাদের দেশেরই সন্তান। ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার বিজয় এ ব্যাপারটিকে একটি নতুন তুঙ্গে নিয়ে এসেছে। ঢাকার লোক বলাবলি করে যে, শেখ হাসিনার নিজেরও অসলোর এই পুরস্কার পাওয়ার স্বপ্ন ছিল।’
‘প্রফেসর ইউনূসের কীর্তিকে ক্ষতি করার প্রচেষ্টায় (প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দল) আওয়ামী লীগ দুটি বিষয়ের সুযোগ নিচ্ছে। প্রফেসর ইউনূসের কাজের লক্ষ্য হচ্ছে পল্লী অঞ্চল, শহুরে মানুষের কাছে এর আবেদন কম। যদিও ক্ষমতার অনুগ্রহপ্রত্যাশী ধনকুবের মালিকদের নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় পত্রিকায় তাঁর প্রতি বৈরী ভাবটির কারণ বোধগম্য, এদেশের সুশীল সমাজের বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা বেশ পীড়াদায়ক। দ্বিতীয় যে সুযোগটি নেয়া হচ্ছে—ক্ষুদ্রঋণ মডেলটি নিয়ে বর্তমান তাত্ত্বিক সঙ্কট। একসময় সর্বত্র ধন্বন্তরী মনে করা হলেও এর কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। ভারতে কিছু কিছু ক্ষুদ্রঋণ নামধারী আগ্রাসী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড অনেক ঋণজর্জরিত দরিদ্র মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ সিস্টেমে এমনটি ঘটেনি, তবু সন্দেহের দৃষ্টি এখানেও।’
‘তাহলে এখন কী হবে? ঢাকায় বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করবে যদিও সরকারের রয়েছে এতে স্বল্প শেয়ার; আর প্রফেসর ইউনূসকে এর প্রধানের পদ থেকে সরাবে। পশ্চিমা জগতে এর প্রতিক্রিয়া কী হয়েছে? হিলারি ক্লিনটন শেখ হাসিনাকে ফোন করে এ বিষয়ে তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমরা একটি ব্যানানা রিপাবলিক নই।’ (ভাবখানা যেন) ইউনূসবিরোধী ষড়যন্ত্রের ফলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে কী আসে যায়?